ছড়াকার খান মোহাম্মদ খালেদের ‘টুবটুব জলডুব’ ছড়াগ্রন্থটি সত্তর দশকের (১৯৭৫-১৯৭৮) শিশুসাহিত্যের এক উজ্জ্বল স্মারক। এই গ্রন্থের ছড়াগুলো যেন সদ্য ধুয়ে আনা স্ফটিক জলের মতো স্বচ্ছ, যেখানে গ্রামীণ প্রকৃতি, শৈশবের দুরন্তপনা ও কল্পনার অবাধ বিস্তার প্রতিবিম্বিত হয়েছে। এই লেখাগুলো প্রমাণ করে খান মোহাম্মদ খালেদ শিশুমনস্তত্ত্বের একজন সফল কারিগর।
গ্রন্থটির ছড়াগুলোর পরতে পরতে...
আরো পড়ুন
ছড়াকার খান মোহাম্মদ খালেদের ‘টুবটুব জলডুব’ ছড়াগ্রন্থটি সত্তর দশকের (১৯৭৫-১৯৭৮) শিশুসাহিত্যের এক উজ্জ্বল স্মারক। এই গ্রন্থের ছড়াগুলো যেন সদ্য ধুয়ে আনা স্ফটিক জলের মতো স্বচ্ছ, যেখানে গ্রামীণ প্রকৃতি, শৈশবের দুরন্তপনা ও কল্পনার অবাধ বিস্তার প্রতিবিম্বিত হয়েছে। এই লেখাগুলো প্রমাণ করে খান মোহাম্মদ খালেদ শিশুমনস্তত্ত্বের একজন সফল কারিগর।
গ্রন্থটির ছড়াগুলোর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলার চিরায়ত রূপ। ‘উড়কি ধানের মুড়কি’ বা ‘জল টলমল পদ্মপুকুর’-এর মতো রচনাগুলো পাঠককে সরাসরি নিয়ে যায় মাটির কাছে, যেখানে ‘বিড়াল মাসি’ দই পাতে আর পদ্মফুল ‘ঘোমটা দেয়া বধূ’র মতো লাজুক হাসি হাসে। এই চিত্রকল্পগুলো শুধুমাত্র গ্রামীণ পটভূমি তৈরি করে না, বরং প্রকৃতির সঙ্গে শিশুদের এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
কিন্তু এই ছড়াগুলোর প্রধান আকর্ষণ হলো এদের অদ্ভুত কৌতুকময়তা এবং কল্পনা। ‘অদ্ভুত ব্যাপার’ বা ‘মজার ঘটনা’ ছড়ায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক অথচ মজাদার দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে- কুয়া থেকে মোয়া তোলা বা বরই গাছে গরম খই ধরার মতো ঘটনা। এই অসঙ্গতিগুলোই শিশুদের কৌত‚হলকে উসকে দেয় এবং তাদের হাসির খোরাক জোগায়। ‘উলটা পালটা’ ছড়ায় বোয়াল মাছের আমড়া গাছে বাসা বাঁধা বা চিল-কাকের সাঁতার কাটার চিত্রকল্পে যে উদ্ভট রসিকতা রয়েছে, তা শিশুতোষ রচনার এক অপরিহার্য দিক।
তবে এই গ্রন্থ শুধু হাস্যরসের আধার নয়, এর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে মিশে আছে সরল নীতিবোধ ও সামাজিক বার্তা। ‘পশুর জেল’ ছড়ায় একটি বানরের আত্মজিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে অপরাধ, শাস্তি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়কে অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ‘নয়াবধূ’ ছড়ায় ডাকাতদের রুখে দাঁড়ানো বধূর চিত্রটি তৎকালীন সমাজে নারীর সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
ছন্দ ও ভাষার ক্ষেত্রে খান মোহাম্মদ খালেদের দক্ষতা অনবদ্য। তাঁর ছড়াগুলো স্বতঃস্ফূর্ত লয়, ধ্বনিময়তা এবং সহজ-সরল শব্দ ব্যবহারে গতিশীল। ‘টুবটুব জলডুব’নামটির মতোই প্রতিটি ছড়া যেন এক একটি ডুব; পাঠককে মুহূর্তেই আনন্দের গভীরে নিয়ে যায়।
সবমিলিয়ে, ‘টুবটুব জলডুব’ কেবল সত্তর দশকের ছাপ বহন করে না- বরং এর হৃদয়ছোঁয়া, গ্রামীণ সৌন্দর্য এবং মনকাড়া কল্পনাশক্তির জোরে এটি আজও যেকোনো শিশুর পাঠের জন্য একটি নির্মল এবং আকর্ষণীয় গ্রন্থ। গ্রন্থটির মাধ্যমে শৈশবের নির্ভেজাল আনন্দকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এক সফল প্রচেষ্টা।
কম দেখান